সোনার বাংলা গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে, তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

সোনার বাংলা গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে, তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।
Website created by Prof. Dr. Ananda Kumar Saha, Dept. of Zoology, Rajshahi University. অধ্যাপক ডঃ আনন্দ কুমার সাহা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

পনেরো আগস্ট রক্তশিশিরে শোকের সিম্ফনি ---- আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

সমরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে সূচিত পার্থক্যের আদি উদাহরণ অনুসন্ধান করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ফিরে যেতে হয় সভ্যতার সূতিকাগার প্রাচীন গ্রিসের দুই নগররাষ্ট্র এথেন্স ও স্পার্টায় উদ্বোধিত স্বতন্ত্র শাসন কাঠামোর সেই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ কালপর্বে। স্পার্টার স্পর্ধিত আত্মগৌরব ও ঐশ্বর্যের যে আবহ রচিত হয়েছিল তার পুরো অংশে ছিল সামরিক আস্ফালন ও নিষ্ঠুরতার অমোঘ বহিঃপ্রকাশ; পেশীর প্রাবল্যে শক্তিমত্তার অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত তারা জারি করেছিল কিন্তু শক্তিকে স্থিতিগৌরবে অভিষিক্ত করতে চাইলে সুরুচি ও সংস্কৃতির যে পরিশীলন আবশ্যক স্পার্টার সেটা না থাকায় তারা সুশীল সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে পারেনি, যদিও যুদ্ধলব্ধ বিজয় তারা উপভোগ করেছে পুরো মাত্রায়। অন্যদিকে এথেন্সের অহঙ্কার তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, তার সংস্কৃতিবাহিত সুরুচি, তার শ্রেয়বোধ-আশ্রিত নীতিকৌশল ও সর্বোপরি সভ্যতাসন্ধানী মৌল প্রবৃত্তি।
এথেন্স-স্পার্টা দ্বন্দ্বযুদ্ধে সামরিক জংলিতন্ত্রের বিজয় সূচিত হয়েছিল সত্য, কিন্তু স্পার্টার উচ্ছৃঙ্খল উত্থানে সভ্যতার যে অবমাননা তা উত্তরকালের মানব প্রজন্মের নিকট সশ্রদ্ধ সমর্থনে গৃহীত হয়নি। বরং সমরতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যটার নিরেট চিত্রটি নগ্নভাবে প্রতিভাত হয়েছে; অস্ত্রশক্তি কীভাবে আক্ষরিক বিজয় অর্জন সত্ত্বেও মনুষ্যত্বের মহিমাকে খর্ব করে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে স্পার্টা অনাগত কালের কাছেও মূর্তিমান সাক্ষী হয়ে থাকবে। গ্রিসের উৎসভূমি থেকে সমরতন্ত্র যেদিকেই বিস্তৃত হয়েছে সে তার মৌলিক চরিত্রটি অক্ষত রেখেছে; পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশ পর্বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে সমরতন্ত্রের প্রাচীন চেহারাটিই খুঁজে পাওয়া যাবে। আইয়ুবী সমরতন্ত্র, ইয়াহিয়ার সমর শাসন, জিয়া-এরশাদ সামরিক স্বৈরবাদ পর্যবেক্ষণ করলে উপলব্ধি সহজ হবে প্রত্যেকটি স্তরপর্যায়ে অস্ত্রের অবলম্বনে নিরস্ত্রের নিপীড়ন সাধিত হয়েছে; বিশৃঙ্খলার বৈরিতায় শৃঙ্খলার বিন্যাসকে বিপর্যসত্ম করে জন-আকাঙ্ক্ষার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে। গ্রিসের প্রাচীন ব্যবস্থায় সমরতন্ত্রের ধ্বংসাত্মকতাকে যে মাত্রায় প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোয় সমরতন্ত্রের অপ্রত্যাশিত ভূমিকাকে তার চেয়ে অধিক মাত্রায় আক্রমণের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত এজন্য যে সেখানে সামরিক বাহিনীর কৃতকার্যতা গণতান্ত্রিক শাসন-প্রণালীর সিদ্ধি ও সৌকর্যে নিবেদিত থাকার অঙ্গীকারকে আইনী অপরিহার্যতায় ধার্য করা হয়েছে। অস্ত্রের ভূমিকা উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ, নীতি-নিরপেক্ষ ও পরিস্থিতি-নিরপেক্ষ; অস্ত্রকে ধারণ করে যে হাত এবং হাতকে নিয়ন্ত্রণ করে যে মনীষা তার সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে সমরাস্ত্রের সাধ্যতার প্রসঙ্গটি। বেসামরিক বৃত্ত থেকে সামরিক জগদ্বলয় মনস্তাত্তিকভাবে বৃহদাংশে বিচ্ছিন্ন বলে যে নীতিনিষ্ঠায় গণতন্ত্র পথ চলে সমরতন্ত্রে তাকে সন্তোষজনক মাত্রায় আত্মস্থ করতে পারে না। ফলে সেনাছাউনিতে পঠিত শপথবাক্য গণতন্ত্রের তৃণমূল তাঁবুর নিচে এসে প্রলোভন ও প্রশ্রয়ের লাল কুয়াশায় খেই হারিয়ে ফেলে প্রায়শ। কিন্তু এ যুক্তিতে সামরিক দুষ্কর্মকে বৈধতা প্রদানের কোন ইশারা এখানে নেই; কারণ সেনাসমষ্টির সংহতি ক্রিয়া শ্লথ হলে বাহিনী ভেঙে নানা সময়ে ছদ্মলঘিষ্ঠ ফ্র্যাকশনের উদ্ভব ঘটে, যার চালিকাশক্তি অশুভ বহির্বলয় থেকেও সঞ্চালিত হওয়া অসম্ভব নয়।
এতক্ষণ যা বললাম তাকে যদি ইতিহাস-গভীর গৌরচন্দ্রিকা বলে ধরে নিই তবে তারও একটি কার্যকারণ স্বীকার না করে গত্যন্তর নেই, যখন আমার মূল আলোচনার চলন-পথ পনেরো আগস্ট উনিশ শ' পঁচাত্তরের ঘটনাক্রমকেই সর্বদা স্পর্শ করে এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে সেনাশক্তির স্খলিত ভগ্নাংশ মাত্র সক্রিয় ছিল নাকি তার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল অখণ্ড সেনাবাহিনী ও বহির্শক্তির বিভিন্ন উৎস সে বিতর্কের নিষ্পত্তি জরুরী হলেও তার আগে মুক্তিযুদ্ধের খোদ ময়দানে আমরা একটু ঘুরে আসার পক্ষপাতী। পক্ষপাত এজন্য যে জনক হত্যার ট্র্যাজেডিপর্ব মঞ্চায়নের রিহার্সেল যখন শুরু তখন জনকের জন্ম ঘটেনি, তখন তিনি জাতি-স্থাপনার সমুদয় মালমসলা জড়ো করেছেন মাত্র। দরিদ্র বিশ্বের নাট্যমহড়া নিয়ন্ত্রণে মার্কিন মুলুক থেকে বাড়িয়ে দেয়া হাতের সঙ্কেত উপেক্ষা করার শক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর, সে শক্তি সনাতনী সহজ শক্তি নয় যার প্রমাণ নিহিত ছিল পরাশক্তির ফিরিয়ে নেয়া হাতে। হাত ফিরিয়ে নেয়া সহজ; কূটমতলবের কায়েমী ক্লেদ ধুয়ে ফেলা সহজ কথা নয়। নাটের গুরুর নটবহর, যাকে আবার সপ্তম নৌবহরও বলা যায়, তা তো এগিয়ে আসার কথা আমরা শুনেছি। আহত শক্তির ক্ষুব্ধ খোদ সত্তা ঝিম ধরে হয়ত বিবরে লুকিয়ে ছিল পঁচাত্তরের অপেক্ষায়। সে শক্তি মার্কিন শক্তি, সে জাতির নাম সেনাবাহিনী। সে সময়ের দ্বি-প্রকোষ্ঠ পৃথিবীর অপর প্রকোষ্ঠে সন্নিহিত দুই কোষ সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চীন, আরও একটু অবরোহী কায়দায় যদি বলি মস্কো আর পিকিং, তাহলে এদের একটিও যে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আহত হিম্মতে গুটিয়ে পড়েছিল সে গল্পই-বা অজানা কার? মানুষমাত্রই আদর্শের প্রতিফলন, সে অর্থে যত মানুষ আদর্শের তত সংস্করণ স্বীকার্য হবার কথা, কিন্তু বাস্তবে একের আদর্শ যখন দশের অনুমোদনে গ্রাহ্য হয় তখন সমাজে নানা আদর্শশ্রেণী বা নীতিগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে। আদর্শশ্রেণীর নিয়ন্তা হিসেবে এমন কেউ একজন অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন যার আছে সেই ক্ষমতা যার সহায়তায় তিনি ঐ আদর্শমানকে কোন একটি ভৌগোলিক পরিসীমায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি এক প্রবল ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালী জাতিসত্তার ক্রমগঠিত আদর্শিকতাকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করেন। আদর্শ প্রতিষ্ঠার সেই সংগ্রামে গণমানুষের অধিকার প্রশ্নটি সম্পৃক্ত থাকায় সম-আদর্শিক জনগোষ্ঠী তাতে একাত্মতা ঘোষণা করে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে অবশ্য অন্য আদর্শগোষ্ঠীর বিরোধী প্রচেষ্টাকেও অভিন্ন সংবেদনায় গ্রহণের প্রশ্নটি উত্থাপিত হতে পারে। এর জবাবে এটা বলা যায়, আদর্শের অভিমান তখনি অগ্রাধিকার পেতে পারে যখন তার সঙ্গে নীতিসমর্থন ও বাস্তবতার অনুমোদন সংলগ্ন থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আদর্শিক মানদণ্ডে বাঙালী জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নিবেদিত হয়েছিলেন তা ছিল ন্যায্যতার আদর্শ এবং একই সঙ্গে বাস্তবতার আদর্শ। বিরোধী শক্তিগুলো তাত্ত্বিকভাবে তাদের আদর্শচিন্তার অনুকূলে যুক্তি উত্থাপন করতে পারে; কিন্তু ব্যবহারিক রীতিসূত্রে তাদের আদর্শচিন্তায় মানব মঙ্গলের বৃহত্তর আকুতি যুক্ত না থাকায় এবং স্বীকৃত সাধারণ নীতিতত্ত্বে তাদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা কোনক্রমেই অনুমোদন পেতে পারে না। ধর্মকুহকের ঘোলা চশমায় তারা যা অবলোকন করেছে তাতে মানবতার আবেদনটি এমন বেদনাদায়কভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে যে তাকে কায়েমী স্বার্থান্ধশ্রেণীর আত্মপ্রবঞ্চনাই শুধু বলা চলে। মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ নয় মাসে পাকিস্তানী শত্রুপক্ষ ও এদেশীয় তাঁবেদার শ্রেণী মানবতার সাধারণ সূত্রের উল্টো অবস্থানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরাজয় স্বীকারে বাধ্য হলেও পরাজিত অপশক্তি তাদের ষড়যন্ত্রের কলকাঠি অব্যাহতভাবে নেড়েই চলছিল; শুধু তাদের ভূমিকার ধরনকৌশল পাল্টে গিয়েছিল। নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তারা অসহযোগী ভূমিকা পালনই শুধু করেনি, চক্রান্তের অজস্র কৌশল অবলম্বনে তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধুকে তারা একটি মূর্তিমান বিরোধী আদর্শ হিসেবে দেখত বলে তিনি ছিলেন তাদের ষড়যন্ত্রের সাক্ষাত প্রতিপক্ষ।
পনেরো আগস্ট হত্যাকাণ্ডকে শ্রেণীকরণের নানা অভিধায় চিহ্নিত করা হয়ে থাকে এবং এ চিহ্নায়ন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিরুদ্দেশ বিভ্রান্তি ও অবোধ আত্মপ্রবঞ্চনার গড্ডলিকাস্রোত যেন প্রবাহিত হয়েই চলে। লোকশ্রুতি-নির্ভর, কিংবদন্তি-আশ্রিত এবং কল্পনাপ্রতিভা-উদ্ভূত সবচেয়ে দুর্বল ও দূরাশ্রয়ী যে ধারণাবাদ চালু আছে তা এই যে আগস্ট ট্র্যাজেডি ব্যক্তি-আক্রোশ, সম্পর্ক-বিচ্যুতি ও স্বার্থ-সমীকরণের উপজাত হিসেবে সংঘটিত হয়েছিল। এ মতের সমর্থক উপাদান হিসেবে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের কারও কারও এবং তাঁর আনুকূল্যপ্রাপ্ত ও অনুগৃহীত গোষ্ঠীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ঘটনাসূত্রকে হাজির করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু যে হত্যাকাণ্ড একটি জাতির ইতিহাসের গতিপথকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে, একটি হঠকারী অভ্যুদয়কে উস্কে দেয় এবং একটি চিহ্নিত অপ-আদর্শের সরণি খুলে দেয় তাকে ঠুনকো ব্যক্তিসম্পর্কের বিপর্যয়-উদ্ভূত পরিস্থিতি হিসেবে ধরে নেয়া বিভ্রান্তির বিলাসিতা বৈ কিছু নয়। ঘটনা-পরবর্তী দৃশ্যপট এবং এ যাবতকালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পর্যবেক্ষণে উল্লেখিত মতচিন্তাটি এতটাই সত্যপরিহারক যে এ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কোন অবকাশ নেই।
দ্বিতীয় ধারণাবাদের বিষয়ে এবার আলোকপাত করা যেতে পারে : এ মতের মূলকথা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড একটি নিছক রাজনৈতিক সংঘটনা এবং এর সেনাসম্পৃক্তি কার্যত উপরিতলের দৃশ্যচিত্র ছাড়া কিছু নয়; সেনাশক্তি একটা সুবিধাকর অবলম্বন হিসেবেই শুধু নিয়োজিত হয়। কিন্তু মূল ঘটনাক্রমের সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক উভয় প্রকার সম্পৃক্তি, বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত দলিল, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক ধারাভাষ্য এবং বাস্তব ঘটনাগুচ্ছের ধারাপাত বিশ্লেষণে মতবাদটির সারবত্তা এমনিতেই নিঃশেষিত হয়ে পড়ে এবং তার বিপক্ষে যুক্তিবিন্যাসের আদৌ কোন প্রয়োজন পড়ে না। তৃতীয় মতামত যেমন শক্তিমান তেমনি প্রভাব-বিস্তারী, যেমন জনসমর্থিত তেমনি বহুল-বিশ্লেষিত, যেমন বিস্ততপট তেমনি সহজ-স্বীকৃত। প্রাগ্রসর চিন্তকগোষ্ঠী, যুক্তিনিরীক্ষাবাদী বুদ্ধিজীবী ও আওয়ামী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এ মতের সমর্থকশ্রেণী। মতবাদটির সারবত্তা এই যে সামরিক বাহিনীর একটি নীতিভ্রষ্ট, আদর্শচ্যুত ও বিপথগামী অংশ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে মদমত্ত হয়ে সামরিক নীতিশৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে অবশ্য রাজনৈতিক বলয়ের আস্কারা, সম্পৃক্তি ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখিত হয়ে থাকে। এটাকে অতিক্রমের প্রচেষ্টায় যুক্তিবিন্যাস না করে আমরা আমাদের চতুর্থ মতবাদের আলোকে বাস্তবতা উদ্ঘাটনের প্রয়াস পেতে পারি। প্রস্তাবিত মতচিন্তনে সংশ্লেষণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে চাই এবং এটাও বলতে চাই যে এখানে সামগ্রিক বাস্তবতার একটি জটিল ও শাখা-প্রশাখাময় পরিচিত্রণ উপস্থাপিত হবে। তবে উল্লেখ্য যে, এ প্রক্রিয়ায় আমরা সামরিক বাহিনীর সর্বতল সংশ্লিষ্টতা প্রতিপাদনের দিকেও যথেষ্ট মনোসংযোগের পক্ষপাতী। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট চেতনার ধারকশ্রেণী হিসেবে আমরা বরাবরই বলে এসেছি সেনাবাহিনীর স্খলিত ভগ্নাংশ এমনকি হাতেগোনা কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিকই এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কালপ্রবাহের স্বাভাবিক রীতির ভেতর দিয়ে এবং তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর পরবর্তীকালের কর্মচারিত্র্য পর্যবেক্ষণে ও কীর্তিনিরীক্ষায় উপলব্ধ হয় একটি 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর সর্ব পর্যায়ে ঘটিতব্য সম্পর্কে সাধারণ অবগতি অবশ্যই ছিল।
তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কোন অংশের প্রধান হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দেননি একথা সত্য, কিন্তু নিরাসক্ত প্রক্রিয়ায় হলেও তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। শোনা যায় হিমালয়ের পাদদেশে একশ্রেণীর সন্ন্যাসী আছে যারা মস্তিষ্ককে চিন্তাশূন্য করার সাধনায় পুরো জীবন খরচ করে ফেলে। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সে সময় অনেকটা সেইসব সন্ন্যাসীর মতো ভূমিকা রেখেছিল। বিভিন্ন কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ, আসামিদের সাক্ষ্যবিবরণ, কথাবার্তা-কাজকর্ম, সাক্ষাতকার-বিবৃতি, বিক্ষিপ্ত গবেষণাকর্ম, পত্রপত্রিকা, গ্রন্থপুস্তক প্রভৃতি নানা সূত্র পাঠ করে উপলব্ধি করা যায় সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে কারও কারও 'ট্যাসিট সাপোর্ট' ছিল, কেউ কেউ সামগ্রিক বিষয়কে ক্রীড়া-কৌতুকের উৎস হিসেবে উপভোগ করেছেন এবং সেনাচরিত্রের জংলি প্রবণতাপ্রসূত স্বপ্ন পর্যন্তও হয়ত দেখে থাকবেন; অন্তত বাংলাদেশের পরবর্তী সেনা উপদ্রবের ইতিহাস থেকে তা অনুমান করা অমূলক হবে না।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রখণ্ডের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠায় সরকার কাঠামো এবং বেসামরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সামরিকীকরণের গভীর ছায়াপাত ঘটেছিল। সমরযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বাইরে নগণ্য সংখ্যক বিদ্রোহী সেনাসদস্যের পক্ষে যদি এত বড় শক্তির প্রদর্শন সম্ভবপর হয় তাহলে সেনাশক্তির পারঙ্গমতা, আত্মমর্যাদা ও কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া যুক্তিসঙ্গত।
যেখানে সেনাবাহিনীর স্বদেশপ্রেমের একটি বহুল উদ্ধৃত কিংবদন্তি সম্পর্কে আমরা অবগত সেখানে আমাদের যে অংশ আগস্টের নৃশংসতাকে সামরিক সংঘটনা হিসেবে স্বীকারের প্রশ্নে ভীত এজন্য যে তা এটাকে গ্রহণ করলে রাজনৈতিক ব্যর্থতার চিত্রটি উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে, তারা প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধুর দেশপরিচালন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রভাবনায় আমি অন্তত এ প্রবোধ মানতে পারি যে সেনাবাহিনীর ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ তার নিজস্ব স্খলন দ্বারা প্রভাবিত ও প্রলুব্ধ বটে। এ বিষয়টিকে পোক্ত করতেই সেনাচারিত্র্যের একটি সংক্ষিপ্তসার ইতিহাসের স্মরণ নিয়েছি লেখার শুরুতেই। প্রবল প্রস্তাবনা আকারে আমি বলতে চাই সামরিক স্খলন বিনা মেঘে বজ্রপাতের কোন ঘটনা নয়, বরং তা প্রায়শই ঘটে থাকে। এদিকটায় মনোনিবেশ করলে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের অরাজক ভূমিকার যে উদ্দেশ্যবাদী গালগল্প হাজির করা হয় তার যৌক্তিক সমর্থনযোগ্যতা খারিজ হয়ে যায় এবং আমরা অনায়াসে প্রশাসন-রাজনীতির খোদচিত্রটি উদ্ধার করতে পারি। সেখানে অবশ্য আমাদের পক্ষ থেকেও প্রশাসন-ব্যর্থতার অংশবিশেষের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে এবং এটা এজন্য যে রাজনৈতিক বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্নে আমাদের আছে একটি গ্রহণশীল সংবেদনা ও অনুভূতির সত্যগ্রাহ্য অনুপাত। স্বীকৃত বাস্তবতার যে অংশে আমাদের অবস্থান সেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধোত্তর যথেচ্ছাচার ও কূটমতলবী কারিশমার উদগাতাশ্রেণীর কাঁধে অভিযোগের অনেকাংশই ঝুলিয়ে দেয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর সংগঠনীকৃত আদর্শের বিরোধী শিবিরে যাদের অবস্থান হিংসাত্মক ও ধ্বংসমুখী হয়ে পড়েছিল তারা আবার ভৌখণ্ডিক ও বহিঃভৌখণ্ডিক অজস্র প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য পাঁয়তারার সুতোকলে বন্দী ছিল। পরাজিত বিচুতশ্রেণী সর্বতলের সংশ্লিষ্টতায় এমন ঘনবদ্ধ বুনুনির নীলনকশা কেটেছিল যে বঙ্গবন্ধুর শুভবাদী দূরবীক্ষণকাঠামোকে বিকল করতে সদানিবিষ্ট ছিল।
নিজ বলয়ের ছদ্মশত্রু, গৃহবিভীষণ মোশতাক ও তার কুলাঙ্গারশ্রেণী মীরজাফরী ট্র্যাজেডি-নাট্য পরিচালনা করেছে। সেনাবাহিনীর তৎকালীন দ্বিতীয় কর্তৃত্ব জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তিন বাহিনীর তিলকধারী তিন প্রধানের নিকট ঘটিতব্য নৃশংসতার অগ্রভাষ্য মজুদ থাকতেও তারা তাদের সেনাশপথের মর্মবাণীকে মর্যাদা দেয়নি। সামরিক বিবেক বলতে যদি কোনকিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় তবে তার বিরুদ্ধ ভূমিকা তারা পালন করেছে নিষ্ঠুর নিরাসক্তি ও নির্বোধ নিষ্ক্রিয়তার বহিরাবরণে। প্রক্রিয়ার প্রতি মৌমতা প্রদর্শন মূলত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণেরই নামান্তর। অনাগতকালের সন্ধানক্রিয়া ও গবেষণাকর্মে, আমাদের বিশ্বাস, সেনাশক্তির আদর্শপতন ও তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এমন স্থিতবলিষ্ঠ বাস্তবতা উগলে দেবে, যা আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারবর্গের পরিণতি আসলে তাদের পালিত ভূমিকার প্রতিদান নয়, বরং তা আদর্শবিচুত স্বার্থান্ধশ্রেণীর কূটকারসাজিরই অভিঘাত মাত্র।
এবার পঁচাত্তরের সামরিক-চিত্র যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বেসামরিক বক্ররেখার অমিত বিস্তার, তার একটা দৃশ্যচিত্র গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে অংশ নিয়েছিল সামরিক বাহিনী থেকে চাকরীচ্যুত কিছু কর্মকর্তা, চাকরিতে বহাল কতিপয়ের কমান্ড ও সাধারণ সিপাহী এবং সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট, আর্মড কোর, বেঙ্গল ল্যান্সার, আর্টিলারি প্রভৃতি এতে ব্যবহৃত হয়েছে। ট্র্যাজেডি-ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এসে তারা সংবিধান-অতিরিক্ত কর্তৃত্ব প্রয়োগে সেনাবলয়ের নিচেই মূলত পুরো ভূ-খণ্ডকে করায়ত্ত করে এবং সামরিক ফরমানের ফন্দি-ফিকিরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে সমগ্র বাংলাদেশ। কোনো দেশে সামরিক আইন জারির অর্থ দু'রকম হতে পারে : এক. তা সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া-উদ্ভূত; দুই. বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা-নৈরাজ্যের বিপন্নতা-প্রসূত। পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সেনাপ্রাধান্য পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সেখানে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা গৃহযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কোন বিপর্যয়ের মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনা ঘটেনি। তাদেরই কিংবা তাদের কথিত একাংশের কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় তাদের অবতরণ ঘটে। এ থেকে সামরিক প্রভাব-প্রাধান্যের নেপথ্য নিয়ামক হিসেবে সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষ ও স্খলনকেই দায়ী করা যায়।
দ্বিতীয় বিপ্লবের রূপরেখা ধরে এগিয়ে গেলে যুদ্ধভূমিকার পাশাপাশি সংস্কার ভূমিকার ক্ষেত্রেও যে বঙ্গবন্ধু অনন্য হতেন সে বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি বিরোধী কূচক্রীমহল। এ প্রচেষ্টা নিরর্থক করে দেয়ার হীন চক্রান্তে তারা বঙ্গবন্ধু তথা তাঁর প্রোজ্জ্বল আদর্শকে হত্যা করে। পরাজিত অপশক্তি যুদ্ধের ময়দান থেকে পা গুটিয়ে নিলেও বিগঠন কর্মকাণ্ডে তারা প্রতিবন্ধক ভূমিকা প্রত্যাহার করে নি। কায়েমি শোষণের প্রাচীন ঐতিহ্যধারা অব্যাহত রাখতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। সাধারণ ক্ষমার উত্তরপর্বে আলশামস্, রাজাকার, আলবদরের অনেক সদস্যই কারাগারে বিচারের প্রতীক্ষায় ছিল; চিহ্নিত এসব গণশত্রুর দণ্ড হলে দেশ থেকে পাকিস্তানি ভাবধারা বিলুপ্ত হবে এটা ছিল তাদের প্রধান আশঙ্কা। যে ক'জন সেনাকর্মকর্তা (মেজর) সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তারা সামরিক বিধির স্বাভাবিক নিয়মেই সে দণ্ড পেয়েছিলেন। হত্যা প্রক্রিয়ায় তাদের সংশ্লিষ্টতা তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের প্রকাশ মাত্র। বঙ্গবন্ধুর বাসস্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে অনেকবার তাঁকে সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর অঢেল দেশপ্রেম ও দেশবাসীর প্রতি আস্থার কারণে সেটাকে আমল দেননি; কুচক্রীরা এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে।
মোশতাকের বিরুদ্ধে দুই পাকিস্তানের কনফেডারেশন রাষ্ট্রের তত্ত্বে সমর্থন ও স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার অভিযোগ থাকলেও বঙ্গবন্ধু তাঁকে অপার স্নেহেই কাছে টেনে নিয়েছেন এবং নিঃশর্ত আনুকূল্য প্রদান করেছেন, যেটাকে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছেন।
সামগ্রিক নিরীক্ষণে এ সত্য সহজে প্রতিপাদিত হতে পারে যে জাতিরাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পশ্চাৎভূমি হিসেবে বিশাল-বিস্তৃত এক ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ও কায়েমী কারসাজি প্রক্রিয়া বিজড়িত ছিল, যা একই সঙ্গে জটিল ও বিশ্লেষণসাপেক্ষ। তবে যে বিষয়টি খুব সহজভাবে স্বীকার্য হতে পারে তা এই যে ব্যক্তিত্বশক্তি ও সংগঠনক্ষমতার দ্বিবিধ প্রয়োগে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনীতি প্রক্রিয়ায় এমন বেগবান ও স্বতোচ্ছল উন্নয়ন অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন যেটা বাস্তবায়িত হলে তাঁর আদর্শিক নীতিসংহতি অন্যসব বিরোধী অপশক্তি ও আদর্শবাদের প্রধানতম হুমকি হয়ে দাঁড়াত। যে কারণে দেশী-বিদেশী অজস্র শক্তিকেন্দ্র নানা কূটপ্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে পরাজিত পাকিস্তান আদর্শের পুন-উদ্বোধন ঘটাতে চেয়েছিলো। সেনাবাহিনীই সেক্ষেত্রে উদ্দেশ্যসিদ্ধির প্রধান নিয়ন্তা তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতিদার্শনিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহক হিসেবে তাঁর কন্যা, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের বিগত মেয়াদকালের অনুসরণে অধিকতর আত্মপ্রত্যয়ে উন্নয়ন-অগ্রাভিযান ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে আইনী নিষ্পত্তিসহ সুব্যাপ্ত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুকে যেমন পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট তাঁর বলিষ্ঠ আদর্শবাদের বলি হতে হয়েছিল, ২১ আগস্ট ২০০৪ নৃশংস বোমা হামলায় শেখ হাসিনারও তেমনি প্রাণনাশের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যার কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে পাকিস্তান আদর্শবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিকাশক ভূমিকাকেই নিঃসন্দেহে চিহ্নিত করা যায়। ২১ আগস্ট নৃশংসতার পটভূমি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংগ্রামী কর্মোদ্যোগ সংক্রান্ত বিষয়ে সময়সুযোগমতো অন্য একটি প্রবন্ধ রচনার পরিকল্পনা আছে বলে বর্তমান লেখায় সে প্রসঙ্গে সবিস্তার আলোচনা থেকে বিরত থাকছি।

Notice: This website is not involved in any financial benefit of its owner

.

Please let us know if author or owner of any material available here wants to remove his/her material from this website. Contact: ourmujib@gmail.com .