সোনার বাংলা গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে, তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

সোনার বাংলা গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে, তাঁর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।
Website created by Prof. Dr. Ananda Kumar Saha, Dept. of Zoology, Rajshahi University. অধ্যাপক ডঃ আনন্দ কুমার সাহা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রভাবনা : স্বাধীন বাংলার রূপকল্প তৈরি হওয়ার পটভূমি ----- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমাকে মাঝে মাঝে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, আপনিতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য দীর্ঘকাল পেয়েছেন, তার সঙ্গে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কিছুদিন কারাবন্দিও ছিলেন, অনেক সময় তার সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনাও করেছেন। আপনি কি বলতে পারেন স্বাধীন বাংলা গড়ার পেছনে তার প্রকৃত রাষ্ট্রচিন্তা কি ছিলো? তিনি কি কেবলই পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে বাঙালিকে মুক্ত করে তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন। না এর পেছনে তার কোনো নতুন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা গড়ার ইচ্ছা এবং নতুন রাষ্ট্র ভাবনা মাথায় ছিলো?

আমি এই প্রশ্নটির জবাব দেওয়া অনেক সময় এড়িয়ে চলেছি। প্রথম কথা বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুর আকস্মিক বাংলাদেশ সম্পর্কে বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীদের যে ধারণা, তার সঙ্গে আমার ধারণার বহু ক্ষেত্রে মিল নই। তাদের অনেকে বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড সম্পর্কে অভিজ্ঞ। কিন্তু তার চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কেও সমানভাবে অভিজ্ঞ তা আমি মনে করি না। তারা কথায়-কথায় বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এই সোনার বাংলা বলতে কি তারা বোঝেন, অনেকেই তা ব্যাখ্যা করতে পারেন না।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রভাবনা সম্পর্কে আমি আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা-নেত্রীদের চাইতে বেশি জানি বা বুঝি এমন দাবি করি না। কিন্তু তিনি তার অবসর সময়ে সময়ে প্রায় তার চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আমার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতেন বলে সম্ভবত তার মনের কথাটি আমি অনেকের চাইতে একটু বেশি টের পেয়েছিলাম। পরবতর্ীকালে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো প্রবীণ নেতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি আমার ধারণার মধ্যে বেশ কিছু ফাঁক আছে। অবিভক্ত ভারতে মোহাম্মদ আলী জিন্নার নেতৃত্বে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে, তখন তার জীবনীকার হেক্টর বেলিথো নাকি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মি. জিন্না, আপনিতো পাকিস্তান চাচ্ছেন। কিন্তু এই রাষ্ট্রের রূপরেখা কি হবে? জিন্না জবাব দিয়েছেন, 'আগেতো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হোক, তখন তার প্রকৃতি, রূপরেখা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যাবে। বেলিথো বলেছেন, 'তা ঠিক হবে না। রাষ্ট্র গঠনের আগে

এই রাষ্ট্রের চরিত্র ও রূপ রেখা আপনার ঠিক করা উচিত। নইলে এই রাষ্ট্রের চরিত্র বিচু্যতির আশঙ্কা আছে। আপনি ধর্মীয় আওতার ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তাহলে পাকিস্তান কি একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে? আর এই আধুনিক যুগে কি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব অথবা উচিত?

জিন্না বলেছেন, না পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে না, হবে আধুনিক গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র। বেলিথো বলেছেন, 'তাহলে সেই আধুনিক গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্রের সংজ্ঞা এবং রূপরেখাটিও আপনাকে আগে ভাগেই ঠিক করতে হবে এবং সকলকে জানিয়ে দিতে হবে। নাইলে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র নবজাত রাষ্ট্রকে ধর্মান্ধরা মধ্যযুগীয় ধর্মরাষ্ট্রের পথে টেনে নিয়ে যেতে পারে, জিন্না এই ব্যাপারে বেলিথোর সঙ্গে একমত হননি। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রোগজর্জর শরীর ও মন নিয়ে মৃতু্যর আগে উপলব্ধি করে গেছেন তিনি যে বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করে গেছেন তা থেকে অমৃত ফল উৎপাদনের বৃক্ষ জন্মায়নি। ভয়ঙ্কর বিষবৃক্ষই জন্ম নিয়েছে।

স্বাধীন বাংলার রূপকল্প নির্ধারণে জিন্নার মতো এই ভুলটি বঙ্গবন্ধু করেননি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার বহু আগেই তিনি আওয়ামী লীগের সভা-সম্মেলন আমার সোনার বাংলা গান দ্বারা উদ্বোধন করা শুরু করেন, ধর্মীয় শেস্নাগানের বদলে জয়বাংলা শেস্নাগান গ্রহণ করেন এবং সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে আওয়ামী লীগেরও আদর্শ বলে দেশের মানুষের মনে ধারণা সৃষ্টি হতে দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই দেশের সকল স্তরের মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, কেবল বাংলাদেশকে স্বাধীন করা নয়, এই স্বাধীন দেশটিকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করানোই শেখ মুজিবের লক্ষ্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চার আদর্শকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে সনি্নবেশিত করে দেশবাসীর এই ধারণাকে তিনি সঠিক প্রমাণ হতে দেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে একান্ত আলাপে জিন্নাহ নেতৃত্ব এবং তার পরিকল্পিত পাকিস্তান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর মোহ ভঙ্গ হতে থাকে চলিস্নশের দশকের গোড়াতেই-তিনি যখন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় ছাত্রজীবন কাটাচ্ছিলেন এবং ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। কলকাতা ও চট্টগ্রামে বোমা পড়েছে। দিলিস্নতে ব্রিটিশ ভাইসরয় একটি ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া কাউন্সিল গঠন করেন এবং তাতে পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী স্যার সেকান্দার হায়াত খান ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হককে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

মুসলিম লীগ সভাপতি জিন্না তার অনুমতি না নিয়ে এই সদস্য পদ গ্রহণ করায় হক সাহেব ও সেকান্দার হায়াত খাঁ দু'জনেরই কৈফিয়ৎ তলব করেন। দু'জনেই কৈফিয়ৎ দেন। সেকান্দার হায়াত খানকে জিন্না মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার না করে মাত্র দুই বছর আগে ১৯৪০ সালে হক সাহেব লাহোরে মুসলিম লীগ সম্মেলনে পাকিস্তান-প্রস্তাব উত্থাপন করেন তাকে বহিষ্কার করেন এবং তার মন্ত্রিসভা থেকে শহীদ সোহরাওয়াদর্ী, খাজা নাজিমুদ্দীন প্রমুখ মুসলিম লীগের সকল সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।

তরুণ শেখ মুজিব তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৃহত্তম জনসংখ্যার অধিকারী যে বাংলাদেশ, সেই অঞ্চল ও তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে অবাঙালি জিন্না এবং তার ' কোটেদের' মনোভাব ভালো নয়। এর পর ১৯৪৬ সালে দিলিস্নতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কনভেনশনে (কাউন্সিল অধিবেশন নয়) জিন্না অবৈধভাবে লাহোর প্রস্তাবের স্টেটস (ংঃধঃবং) কথাটা থেকে এস্ শব্দটি বাদ দিয়ে স্টেট করেন, অর্থাৎ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহের বদলে একটি রাষ্ট্র অর্থাৎ এককেন্দ্রিক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন। তখন বাংলায় মুসলিম লীগের নেতাদের মধ্যে আবুল হাসিম তার বিরোধিতা করেন এবং শহীদ সোহরাওয়াদর্ী জিন্নার প্রস্তাব মেনে নেন। তরুণ মুজিব এবার আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, হক সাহেবের পর বাংলার অপর স্বাধীনচেতা ও জনপ্রিয় নেতা সোহরাওয়াদর্ীর নেতৃত্ব খতম করার জন্য জিন্না ছুরিতে শান দিচ্ছেন।

দিলিস্ন থেকে কলকাতায় ফিরে শেখ মুজিব তার নেতা শহীদ সোহরাওয়াদর্ীকে বলেন, পাকিস্তান সম্পর্কে লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করার ব্যাপারে জিন্না আপনার সমর্থন আদায় করে আসলে আপনার জনপ্রিয়তা নষ্ট করা এবং বাংলার নেতৃত্ব থেকে আপনাকে অপসারণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন বলে আমার সন্দেহ হয়।

সোহ্রাওয়াদর্ী এ কথার কোনো জবাব দেননি। ছেচলিস্নশের সাধারণ নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের সর্বাধিক কৃতিত্ব সোহরাওয়াদর্ীর। তিনিই নির্বাচনের পর প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। 'দেশ ভাগ' হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে যখন পূর্ব পাকিস্তানের লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় তখন দিলিস্নর মুসলিম লীগ হাই কমান্ড অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে শহীদ সোহ্রাওয়াদর্ীকে পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব থেকে অপসারণের এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কাঁধে ঢাকার উদর্ুভাষী নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দীনকে (যিনি জিন্নার একান্ত বশংবদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন) চাপিয়ে দেয়ার চক্রান্ত করেন। এই চক্রান্তের প্রধান হোতা ছিলেন জিন্নার দক্ষিণ হস্ত লিয়াকত আলী খান। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে শহীদ সোহ্রাওয়াদর্ীকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন। সিলেট জেলা তখন গণভোটে পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে রায় দিয়ে আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছে। তাদের পরিষদ সদস্যরা তখন পূর্ব প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য হিসাবে গণ্য। লিয়াকত-নাজিম গ্রুপ বিরোধী সদস্যদের পরামর্শ দেন, তারা আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সম্ভব ও সফল করেছেন। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের নবগঠিত মন্ত্রিসভায় তাদের কমপক্ষে পাঁচজন মন্ত্রী পাওয়া উচিত। সিলেট সদস্যরা এই দাবি শহীদ সোহ্রাওয়াদর্ীকে জানান।

শহীদ সোহরাওয়াদর্ী তাতে দৃঢ়তার সঙ্গে অসম্মতি জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব ও সফল করার জন্য সিলেটের মানুষের অবদানের কোনো তুলনা নেই। কিন্তু আমি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হলে মাত্র একটি জেলা থেকে এক মন্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে না। তবে তাদের প্রকৃত দাবি-দাওয়ার প্রতি আমি লক্ষ্য রাখবো। শহীদ সাহেবের কাছে বিমুখ হয়ে সিলেটের প্রতিনিধিরা খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে যান, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সিলেট থেকে তার পাঁচজন মন্ত্রী নিয়োগে সম্মতি জানান। পালর্ামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচনে মার্জিনাল ভোটে হেরে যান শহীদ সোহরাওয়াদর্ী।

সোহরাওয়াদর্ী গ্রুপে তখন ছিলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, টি আলী, আবদুল মালেক প্রমুখ নেতা। তারা কলকাতায় শহীদ সোহরাওয়াদর্ীর থিয়েটার রোডের বাড়িতে পরবতর্ী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য মিলিত হন। শেখ মুজিব এই সভায় শহীদ সোহরাওয়াদর্ীকে বলেন,' লীডার, সিলেটের প্রতিনিধিদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এটা দিলিস্নর মুসলিম লীগ হাই কম্যান্ডের চক্রান্তের ফল। তারা আপনাকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতায় বসতে দিতে চায় না। তারা সেখানে তাদের অনুগত খাজা নাজিমুদ্দীনকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। বাংলার মুসলিম লীগ পালর্ামেন্টারি পার্টিতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। আমি মুসলিম লীগের দিলিস্ন কনভেনশনের পরই আপনাকে বলেছিলাম, বাংলাদেশে হক সাহেবের পর আপনার নেতৃত্ব ধ্বংস করার জন্য দিলিস্নর মুসলিম লীগ হাই কম্যান্ড চক্রান্ত শুরু করেছে। আপনার উচিত, এখনই ঢাকায় গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের দাবি-দাওয়া ও অধিকার রক্ষার স্বার্থে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের প্রস্তুতি নেয়া।

শহীদ সাহেব তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, চারদিকে এখন সাম্প্রদায়িক অশান্তি চলছে। এ সময় পশ্চিম বঙ্গের মুসলমানদের অসহায় এবং নেতৃত্বহীন অবস্থায় রেখে আমার ঢাকায় চলে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মিলে কিছুদিন সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালাবো। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই ঢাকায় যাব।

এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনা মতো সহসা আর ঢাকায় আসতে পারেননি। যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বে লিয়াকত আলী খানের চেয়ে অনেক বড় নেতা ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। জিন্না নব প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের বাঙালিদের অংশীদারিত্ব দিতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই কেন্দ্রীয় স্বাধীন মন্ত্রীর পদ দিতেন। কিন্তু বাঙালি-বিদ্রোহী জিন্না তা দেননি। লিয়াকত আলী তা জানতেন। তিনি ভয় পেতেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। ভাবতেন যে পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী পদে তিনি শক্তিশালি দালীবিদার হয়ে উঠতে পারেন। সুতরাং প্রথম সুযোগেই এই গণপরিষদে শহীদ সাহেবের সদস্যপদ বাতিল করে দেয়া হয় এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানে তার আসার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

শুধু তাই নয়, একদিকে গণপরিষদে শহীদ সাহেবের সদস্যপদ বাতিল করা হয় এবং অন্যদিকে ভরতেও যুক্তপ্রদেশের অধিবাসী লিয়াকত আলী পাকিস্তানে তার প্রধানমন্ত্রীর পদ রাখার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হতে না পেরে পূর্ব পাকিস্তানের বশংবদ মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ-২ কেন্দ্র থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে নির্বাচিত ঘোষণা করেন।

তরুণ শেখ মুজিব এসব ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয় এবং মুসলিম লীগ শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী শিবির গড়ে তোলার লক্ষ্যে অন্যান্য তরুণ নেতাদের সহযোগিতায় গণতান্ত্রিক কর্মী শিবির গঠন করেন। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে (তখন নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক) কর্মী শিবিরের সভায় তিনি বলেন, কোন দেশ বিভক্ত বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল রাজধানী পায়। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে লকানো বসানের যেওরা হয়নি। কলকাতার উপর সদস্য করা হয়েছে সর্দার মিশতার, রাজা গজনফর আলী মত অবাঙালি নেতাদের। ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত শক্তিশালী বাঙালি নেতা থাকতে তাদের এই প্রতিনিধিদলে গ্রহণ করা হয়নি। উদ্দেশ্যটি অতি পরিতাপের। আমরা যাতে কলকাতা না যাই। কলকাতা পূর্ব পাকিস্তানে এলে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দাবি হতো করাচীর অনেক উন্নত এবং সমৃদ্ধ কলকাতাই পাকিস্তানের রাজধানী হোক। এই দাবি এড়ানোর জন্যই স্বেচ্ছায় কলকাতা হাতছাড়া করা হলো।

এরপর ছাত্রলীগের এক সভায় শেখ মুজিব বলেন, কোনো প্রদেশ বিভক্ত করা হলে যে অংশ রাজধানী শহর পায় না, তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কলকাতার জন্য ভারতের কাছে আমাদের নয় কোটি টাকা পাওনা হয়েছিল। সেই টাকা পূর্ব পাকিস্তানকে পেতে না দিয়ে লাহোরের জন্য ভারতকে যে ক্ষতিপূরণের টাকা পাকিস্তানের দিতে হতো, তার সঙ্গে বিনিময় করা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের পাট, তুলা, রেশম, কাঠ, সরিষার তেল, বিড়ি শিল্প ইত্যাদি সবকিছু ধ্বংস করে এখানে পশ্চিম পাকিস্তানের নিকট পণ্যের একচেটিয়া বাজার তৈরি করার প্রচেষ্টা চলছে, তাতে মনে হয় পরাধীন আমলের শোষণ শাসনের চেয়ে ও নিকৃষ্ট ধরনের শোষণ শাসনের যাঁতাকলে আমরা নিষ্পিষ্ট হতে যাচ্ছি। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার পথ অবশ্যই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাঃ অব্যবহিত পর ঢাকার বিরোধী দলীয় কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিলো না। ঢাকা প্রকাশ, চাবুক, 'ফরিয়াদ' ইত্যাদি নামে কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। পরে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের প্রকাশ শুরু। এসব কাগজের ফাইল ঘেটে তখনকার গণতান্ত্রিক কমর্ী শিবির, ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস প্রভৃতি সংগঠনের সভায় প্রদত্ত যুব নেতা শেখ মুজিবের বক্তৃতা বিবৃতিগুলো উদ্ধার করা গেলে দেখা যেতো তখন থেকেই তার মনে বাঙালির স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা তৈরি হতে থাকে।

পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের জন্য দুই অর্থনীতি অনুসরণের যে আন্দোলন শুরু হয়, সেই আন্দোলনের পুরো ভাগে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শেখ মুজিব। এ সময় তিনি নতুন দিন নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন (পত্রিকাটি ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটি হয়ে দাঁড়ায় দুই অর্থনীতি আন্দোলনের প্রকৃত মুখপত্র। পত্রিকাটিতে শেখ মুজিব দুই অর্থনীতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়ে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লেখেন।

স্বাধীন বাংলার রূপকল্প তাই মুজিব মানসে ছিলো না বা সহসা উদিত হয়েছে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা তিন দশক ধরে পর্যায়ক্রমে তার মনে তৈরি হয়েছে। এই পর্যায়গুলোতে কখনো তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। কখনো নিজের রাজনৈতিক সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক করার কাজে এগিয়ে গেছেন। শহীদ সোহরাওয়াদর্ী জীবিত থাকা কালেই পাকিস্তানের মতো ধমর্ীয় জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্রে যুক্তনির্বাচন প্রবর্তনের আন্দোলনে সাফল্য অর্জন করেছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও ছয়দফা আন্দোলনে কারা নির্যাতিত হয়েছেন। জেলে বসে বামপন্থী সহবৃন্দদের কাছে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে দীক্ষা নিয়েছেন। এবং এ দুটি আদর্শ বাস্তবায়ন তার প্রকাশ্য রাজনীতির অংশ করেছেন।

অনেকের ধারণা, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের নেহেরুর মতো মিশ্র অর্থনীতি (সরীবফ বপড়হড়সু) অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন। পুরো সমাজতন্ত্রিক অর্থনীতি অনুসরণের আগ্রহ তার ছিলো না। এ ধারণাটা সম্ভবত সঠিক নয়। আমি বঙ্গবন্ধুর মুখেই শুনেছি, তিনি সমাজতন্ত্রকেই তৃতীয় বিশ্বের প্রধানত কৃষি অর্থনীতির অবকাঠামোর দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের একমাত্র পথ বলে মনে করতেন। তিনি পর্যায়ক্রমে

বঙ্গবন্ধু তার চার দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তার রাষ্ট্রভাবনা ও স্বাধীন বাংলার রূপকথা তৈরি করেছিলেন এবং সেই রূপকল্পের ভিত্তিতেই তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে পূর্ণ স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দেশবাসীকে ডাক দিয়েছিলেন। তার স্বপ্নের, তার রূপকল্পের স্বাধীনবাংলা এখনো তৈরি হয়নি, কিন্তু একদিন যে হবে এই প্রত্যয় আমাদের অনেকের মনেই এখনো বেঁচে আছে এবং থাকবে।

Notice: This website is not involved in any financial benefit of its owner

.

Please let us know if author or owner of any material available here wants to remove his/her material from this website. Contact: ourmujib@gmail.com .