Thursday, 23 September 2010

যুগস্রষ্টা বঙ্গবন্ধু----কামাল লোহানী

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- এ বজ্রনির্ঘোষ উচ্চারণই মুক্তিযুদ্ধের সবুজ সংকেত এবং ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র দ্বিধাহীন নির্দেশ আর ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’ এমন নিঃসংকোচ বলিষ্ঠ ঘোষণা যিনি নিঃশংকচিত্তে দিতে পারেন তিনিই তো মুক্তির দূত। আমাদের এ দেশে একজন আজ থেকে ৯০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তারই নাম শেখ মুজিবুর রহমান। যাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে চিনতে পেরেছিলেন এদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। রাষ্ট্রের প্রথম ও একমাত্র সংবিধান যাকে ‘জাতির জনক’ বলে মান্য করেছে, তিনিই ছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। তারই বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।
পাকিস্তানি শাসক ও শোষকগোষ্ঠী যখন এই ভূ-খণ্ডের সব বাসিন্দাকে ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পঙ্গু করতে মাতৃভাষা বাংলাকেই বিলুপ্ত করার অপকৌশল এঁটেছিল, সেদিন থেকেই যে প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগ্রাম সূচিত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরিতে কেটে ভাগ করা বাংলার এই অংশে তখন তরুণ বয়স থেকে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম, তারপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। কারণ পাকিস্তান আন্দোলনে সোচ্চার বাঙালি এবং বাংলার উদার ও সচেতন মানুষের মোহ ভঙ্গ হতে বেশিদিন লাগেনি। যে প্রত্যাশায় বাংলার অমিততেজ মানুষ মুক্তি চেয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী পরাক্রমশালী শোষক শ্রেণীর হাত থেকে, তা পূরণ তো হয়ইনি, বরং ব্রিটিশ-বিতাড়িত বাংলার এই জমিনে ‘পাকিস্তান’ নামে একটি উদ্ভট দেশের পত্তন ঘটেছিল। তবে ভ্রান্তিবিলাসে বেশিদিন কাটাতে হয়নি আমাদের। আমরা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জানতে এবং বুঝতে পারলাম- কপট পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলার সখ্য সম্ভব নয় এবং বৈরী মানসিকতা তখন থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন তরুণ, তবু তেজ-তেজস্বীয়তায় ছিলেন অগ্রণী। বুঝতে পেরেছিলেন, এ রাষ্ট্রব্যবস্থার বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হতে না পারলে ধুঁকে ধুঁকে এ জাতিকে ধ্বংসই হতে হবে। সুতরাং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র পত্তনের কাল থেকেই। ছাত্র-তরুণ বঙ্গবন্ধু তখন শেখ মুজিব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সে তরুণ আপন নেতৃত্বগুণে চলে এলেন সামনে এবং গণতান্ত্রিক যুদ্ধের অধিনায়কত্ব গ্রহণে দ্বিধা করলেন না। শেখ মুজিব সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন, ব্রিটিশরা যে জিঞ্জির আমাদের হাতে-পায়ে পরিয়ে দিয়ে গেছে, তা থেকে মুক্ত হতে না পারলে জাতি হিসেবে টিকে থাকাই দায় হয়ে যাবে। তাই কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজজীবন থেকে যে পাঠ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন, রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতেই তার বৈভবে ৪৮-এই গ্রেফতার হয়ে গেলেন শেখ মুজিব। এদিকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালেই শাসক মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় ঘটেছিল- পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সৃষ্টিতে। এ নতুন সংগঠনের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন শেখ মুজিব। ইতিহাস বলে, খন্দকার মুশতাক আহমদ সেদিনই মুজিব-বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ মুশতাককে মওলানা সাহেব দ্বিতীয় যুগ্ম সচিব করেছিলেন। সেদিনের বিরোধিতায় কি আঁচ করা গিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর ‘হত্যাকারীর’ উদ্ভব ঘটে গেল? তারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন দু’জনে কিন্তু জেলে আটক মুজিবকে কেন এক নম্বরে রাখবেন, এটাই ছিল খন্দকারের ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ, হিংস্রতায় রূপ নিয়েছিল এবং ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটিয়েই সপরিবারে হত্যা করেছিল হন্তারকরা ১৯৭৫ সালে, ঠিক ২৬ বছর পরে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬-তে ৬ দফা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেভাবে হন্যে হয়ে তাকে হেনস্থা করতে শুরু করল তাতে ফল হল উল্টো। পূর্ববঙ্গের রাজনীতিসচেতন মানুষ উপলব্ধি করলেন, শোষণ-বঞ্চনার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। সুতরাং আজ আর মাথানত করে নয়, বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সময় উপস্থিত। দেশে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে স্বকীয়তা অর্জনের পথে আন্দোলন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সেই বিকল্পের নেতৃত্ব দিলেন সেই শেখ মুজিবই। তিনিই হলেন বঙ্গবন্ধু।
ছয়দফা কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলনই পূর্ববঙ্গবাসীকে দিয়েছিল সাহসে বুক বাঁধার শক্তি, আ্তপ্রত্যয়। তাই মানুষ ছুটল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, সংগঠিত হল। আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে দুঃশাসকের দল নির্যাতনে পোড় খাওয়া নেতায় পরিণত করল। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠলেন তিনি। আইয়ুবি সামরিক শাসন জারি থাকলেও যেন মুজিব-নির্দেশেই দেশ চলবে, এমনই পূর্বাভাস মিলেছিল সেদিন। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সারা পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগের জয়জয়কার। শেখ মুজিবই হবেন পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। কিন্তু আইয়ুবকে গদিচ্যুত করে যে সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তিনিই এ নির্বাচন দিয়েছিলেন। অথচ কত কি কপটতা। নির্বাচনে নিরংকুশ আওয়ামী-বিজয়কে মেনে নিতে পারল না পশ্চিমা কায়েমি স্বার্থবাদীরা। সেখান থেকে বাধল নতুন লড়াই। কারণ নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠদের টপকে ‘পাঞ্জাবি ক্লিক’কে তোয়াজ করতে গিয়ে ইয়াহিয়া এবং পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সমঝোতা হল। বাঙালির হাতে দেশশাসনের ভার দেয়া যাবে না। বিজয়ী আওয়ামী লীগকে বঞ্চিত করতে ঢাকায় ডাকা জাতীয় সংসদের অধিবেশন বাতিল করলে পূর্ববঙ্গ যেন অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করল। এ তো সেই গণজাগরণেরই প্রতিফলন। মানুষ জাগছে নগরে বন্দরে, হাটবাজারে। শুরু হল অসহযোগ, ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অকুতোভয় বাংলার মানুষ ছুটছে মুক্তির সন্ধানে, মুখে তাদের প্রবল উচ্ছ্বাস ধ্বনি ‘জয় বাংলা’। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত দশদিক- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
৭ মার্চ ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু ওই রেসকোর্স ময়দানের সুবিশাল গণজমায়েতে সব স্তরের মানুষকে জানিয়ে দিলেন ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ এবং ‘বিপ্লবের রক্ত ঝাণ্ডা উড়ে আকাশে’।
এরই মধ্যে সামরিক শাসকচক্র ‘সংলাপ’-এর ফাঁদ পাতল। কিন্তু ব্যর্থ হলেন বাংলার সব মানুষের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী হামলে পড়ল বাংলার নিরীহ জনগণের ওপর। অসহযোগ আন্দোলনে যে মানুষ সংগঠিত হয়েছিল, তারা একই ফ্রন্টে এসে দাঁড়াল, সে ছিল মুক্তিফ্রন্ট। নির্বিচারে গণহত্যার বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়াল মোকাবেলা ফ্রন্টে এবং সমুচিত শিক্ষা দিয়ে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে মুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা বাংলার আপামর জনগণ। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর দালাল ছিল কিছু অমানুষ, যারা হয়েছিল মানুষ হত্যার জল্লাদ আর কসাই। ওরাই হল হানাদারদের সহযোগী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত, শিবির, রাজাকার, আল-বদর আল-শামস তথা রাজনৈতিক নয়, ধর্মব্যবসায়ী একটি চক্র। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতাকারী পরাশক্তি মার্কিনিরাও আমাদের গোটা উত্থানকে নিজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার নানা কৌশল এঁটেই চলেছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই। আর দেশী অপশক্তি এবং বিদেশী পরাশক্তির হিংস্র যুগ্মতায় নবজাত বাংলাদেশকে পড়তে হল নতুন সংকটে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে বিভক্ত এবং নিশ্চিহ্ন করার মতলব আঁটল। কিন্তু মুক্তিসংগ্রামে প্রাণোৎসর্গকারী মানুষের এ অগণিত সংখ্যাকে নিশ্চিহ্ন করবে কি করে? তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ওঠেনি শুধু, আন্তর্জাতিক চক্রান্তে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ওই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দেশী-বিদেশী শক্তির দাপট শুরু হয়ে গিয়েছিল। আজও তা অব্যাহত। গোপন হত্যা, প্রকাশ্যে সন্ত্রাস করে নানা অপকৌশলে রাজনীতিকে কলুষিত করার মতলবে যেন মেতেছে।
আজ এমনই রাজনৈতিক উন্মাতাল পরিস্থিতিতে হে মহান নেতা, তোমাকে মনে পড়ছে। বিরোধী অপশক্তি আমাদের ধর্মান্ধ, মোহাবিষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চাইছে, কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ মহাজোট সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে তো আমরা ১৫ আগস্টের খুনিদের ক’জনকে শাস্তি দিয়েছি। কিন্তু আরও ক’জন পালিয়ে বেড়াচ্ছে বিদেশী মদদে, তাদেরও ধরতে তৎপর সরকার। শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। হে বজ্রকণ্ঠ পুরুষ, তুমি যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলে, তা বন্ধ করে সবাইকে ছেড়ে দিয়েছিল জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার। কিন্তু আজ এদেশের সব মানুষের দাবি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং যথোপযুক্ত শাস্তি বিধানের। তখনই তোমায় মনে পড়ছে হে পরম বান্ধব বাঙালির, বঙ্গবন্ধু।
কামাল লোহানী : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী

'দু'হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী'-----আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

বাঙালিত্বকে ভূগোল-বিভাজিত একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অহঙ্কার হিসেবে উদযাপিত, প্রতিপালিত এবং প্রদর্শিত হতে দেখা গেলে যে শীর্ষপুরুষ তার সর্বোচ্চ সাংগঠনিক প্রবক্তার অভিধা পেতে পারেন তিনি নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বক্তব্যের সমর্থনে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মন্তব্য "বঙ্গবন্ধু বিগত দু'হাজার বছরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী" খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে উদ্ধৃত হতে পারে। বাঙালীত্বের মর্যাদাকে পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রতিষ্ঠার দায়ভার আর যারা গ্রহণ করেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা স্বপ্রতিভায় প্রৌজ্জ্বল হলেও জাতিগোষ্ঠীর অবকাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্তার ভূমিকায় তারা বঙ্গবন্ধুকে অতিক্রম করতে পারেননি। ভাষা সাহিত্য দর্শন শিক্ষা সংস্কৃতি প্রভৃতি যেসব অবস্থানে বাঙালী যুগপুরুষেরা তাঁদের কীর্তিফলক সংস্থাপিত করেছেন সে সবের পূর্ণ দীপ্তি স্বীকার করেও বঙ্গবন্ধুকে যে একটি পৃথক অহঙ্কারে বরণ করা যায় তার মূলে আছে এ সত্য যে, মূর্ত বিমূর্ত উভয় শক্তির সম্মিলনে তিনিই একটি টেকসই সংস্কৃতি কাঠামো সূত্রবদ্ধ করতে পেরেছেন।
ব্যক্তি-প্রতিভার বিচ্ছুরণে সমাজের সত্মরোন্নয়ন যে সম্ভব তা সর্বজন স্বীকৃত; কিন্তু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিক বিকাশ কখনও স্থায়ী কোন প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্ম দিতে পারে না বলে সাহিত্যিক, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক বৃদ্ধির বিকিরণ জাতি-সংহতি ও সমাজ-সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারে না। যে কারণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, রবীন্দ্র-নজরুলসহ অন্য কালপুরুষেরা ইতিহাসের যাত্রাকে বর্ণাঢ্য করে তুললেও তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক কৃতিত্বের নিরিখে বঙ্গবন্ধুই শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেতে পারেন; বর্তমানকালের জনজরিপের প্রেক্ষাপটে সেটা ইতোমধ্যে অবশ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।
কোন বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন-গৌরবের প্রতিষ্ঠাকে সম্ভবপর করে তুলেছিলেন সে দিকে দৃষ্টি ফেরালে তাঁর ব্যক্তিসত্তার বিশেষত্ব টের পাওয়া যায়।
জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে ইতিহাস তিনি নির্মাণ করেন তা তাঁকে ব্যক্তিসত্তার গৌরবসীমা ভেঙে জাতিগত গোষ্ঠীসত্তার অহঙ্কারে প্রতিষ্ঠিত করে। ব্যক্তি-একক হিসেবে তাঁর যে কীর্তিমূল্য তা স্ফীত হয়ে জাতীয় অর্জনের বাটখারায় প্রতীকী মূল্যমানে মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে। যে মর্যাদার আসনে তিনি অভিষিক্ত তাঁর জন্য তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে এজন্য যে, সর্বজনীন মূল্যায়নে তিনি জাতিসত্তার সপ্রাণ পতাকা; প্রতীকার্থই যেখানে প্রধান। এ অর্থে তিনি একের ভেতর বহু, সংখ্যার মধ্যে অসংখ্য।
ঔপনিবেশিক মস্তিষ্কের জঞ্জাল হিসেবে দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরিতে ভারতভূমি দ্বিভাজিত হলে মুসলিম জাতিসত্তার যে অন্তঃসারশূন্য উদ্বোধন ঘটে তা দিয়ে জনমানুষের স্বাধীনতার আসল স্পৃহাকে প্রশমিত করা সম্ভব ছিল না। সাতচল্লিশ-উত্তরকাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আড়াই দশকে বঙ্গবন্ধুর এ অনুভব ক্রমাগত পোক্ত হয়েছিল যে, একপেশে ধর্মতত্ত্ব স্বাধীনতার অন্তরায়; এর জন্য চাই জাতীয় চেতনা, বাঙালিত্বের চেতনা।
ইতিহাসের কালপুরুষ যারা হতে পারেন তাঁদের সঙ্গে উত্তর-প্রজন্মের সম্পর্ক স্বভাবত আবেগ-বিচ্ছিন্ন নিরপেক্ষতায় স্থিরীকৃত। যদি জেনারেশন গ্যাপ তিন পুরুষের অধিককালে সম্প্রসারিত হয়, তাহলে একথা একটু বেশিই খাটে। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতার অনুরূপ পরিস্থিতি বাস্তবে বলবৎ না থাকায় তাঁর কীর্তি বিবেচনায় আবেগের সম্পৃক্তি ইতি ও নেতি উভয়ের বাটখারায় বাড়তি ভার যে চাপিয়ে দিতে পারে বুদ্ধিশীল মস্তিষ্কের রায়ে সেটুকু অন্তত স্বীকার্য বলে মেনে নিতে হয়। এ কারণে জাতিসত্তার বর্ণাঢ্য রূপকার হিসেবে এত বড় দুর্লভ কর্মকীর্তির যিনি সাধক তাঁর গোষ্ঠীগত গ্রাহ্যতা সহজে নির্মিত হলেও জাতিগত গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বিতর্ক জট পাকায়। এটা দুঃখজনক হতে পারে, কিন্তু হতাশাব্যঞ্জক নয় এজন্য যে, কালের প্রহার সয়েই ইতিহাসের আলোকস্তম্ভকে তার শিখা জ্বেলে রাখতে হয়। বড়র বিতর্ক বারোয়ারির চেয়ে যে প্রাবল্য পাবে সে তো সাধারণ কথা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাতে আবেগের হস্তক্ষেপ আছে এ কথা সত্য; কিন্তু মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তের কাছে অবনত থেকে এ কথা উচ্চারণ করতে পারি, তাঁর জীবনের সার্বিক সংগঠন যেভাবে রূপ পেয়েছে তাতে বড় জীবনের বিভা ও বৈভব সর্বাংশে দীপ্যমান।
বিভাজনোত্তর চব্বিশ বছরের রাজনৈতিক চক্রাবর্তে বঙ্গবন্ধু অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় পালন করে গেছেন তাঁর আদর্শনিবিষ্ট ভূমিকা। এক্ষেত্রে ধার্মিকতার যে ভঙ্গুর প্রতিশ্রুতি পাকিস্তান আদর্শের নেতৃবর্গ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাতে কৃত্রিমতা যেমন অবলম্বিত হয়েছে তেমনি শোষণের বাহন হিসেবে ধর্মানুভূতিকে সর্বাগ্রে কাজে লাগানোর প্রয়াস লক্ষণীয়। ভূগোল-নিরপেক্ষ ইসলামিকতার ধুয়া তুলে দুই পাকিস্তান অথবা পূর্ব-পশ্চিম দুই বাংলার ধর্মদর্শনের অভিন্নতাকে জোর খাটিয়ে বড় করে দেখানোর সে অপপ্রয়াস বাঙালী মনের সংবেদনায় যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি। বাঙালীর এ বিমুখ মানসিকতার বিক্ষোভে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলে জনস্রোতের গতিমুখ পর্যবেক্ষণ করে তিনি সর্বসামপ্রদায়িক গণনেতৃত্বের হালটিকে শক্ত হাতে ধরতে পেরেছেন। মানব প্রকৃতির শুদ্ধ পাঠ রপ্ত থাকায় ইহজাগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দায়বোধ তাঁর মধ্যে দানা বাঁধতে পেরেছে; মুক্ত মানব সংস্কৃতির পচারিতা তাঁকে বাঙালীর মনোভঙ্গি উপলব্ধির দুয়ার খুলে দিয়েছে। মানবের অক্ষ-তাকে যারা মর্যাদার চোখে দেখতে পারেনি, তাঁরা সমপ্রদায়গত ভিন্নতাবোধের গলি-ঘুপচিতে মানবতাবাদের আদর্শের খেই হারিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর চলার রাস্তাটি নিজের মতো করে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তর্কাতিত প্রত্যয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক তরিকায় অবিচল থেকে সিদ্ধির মোহনায় মিলিত হতে পেরেছেন বৃহৎ মানবের অবিভাজিত মহাসমুদ্রে। এটা ব্যক্তি আদর্শের এক বিশিষ্ট দিক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযুক্তি ভূগোলসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না; হিন্দুত্ব আর মুসলমানিত্ব যখন পরস্পরকে সাংঘর্ষিকভাবে মোকাবিলা করে চলেছে তখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ঔপনিবেশিক আস্কারা ভারতভূমিতে বেপরোয়া ছুরি-চাকু চালিয়ে পূর্ববাংলাকে পশ্চিমবাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। হাজার মাইলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকে তারা ধর্মীয় সংহতি দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছে; কিন্তু জীবনপ্রণালী, সংস্কৃতিনিষ্ঠ, চিন্তাপ্রকৃতি ও ভাষাভাষিতার দৃষ্টিকোণে দুই পাকিস্তানের মধ্যে ধর্মীয় বহিরাবরণ ছাড়া আর কোন লক্ষ্যযোগ্য অভিন্নতার অস্তিত্ব ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সত্যটি উপলব্ধি করতে সম ছিলেন বলে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বাচনে তাঁর ভুল হয়নি।
একাত্তর পরবর্তী প্রশাসন সংশিস্নষ্ট ভূমিকা পালনে তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপিত হতে দেখা যায় তাতে বঙ্গবন্ধুর প্রাণগত বিশেষত্বের প্রতি অবিচারই শুধু করা হয়েছে। চির-ঔদার্যের যে ব্যক্তিমহিমা তিনি ধারণ করেন তাকে বুঝতে না পেরে রাজনীতি বলয়ের একাংশ উদারতাকে স্বেচ্ছাচারিতা ও শক্তিমত্তার অপব্যবহারগত গড্ডলিকায় গা ভাসাতে থাকে। প্রশাসনভুক্ত ব্যক্তিবর্গ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হৃদয়গত বিশালত্বকে শোষণ করে নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রবাহ ও মসৃণতাকে ক্ষুণ্ন করে। 'দ্বিতীয় বিপ্লব' বলে যে কর্মসূচি তিনি বিধিবদ্ধ করেন বৃহৎকালের পরিসরে তা প্রতিপালিত হতে পারলে তার সুফল অনিবার্যভাবে জাতির জন্য ভোগ্য হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সে সময়কার জটিলতর বৈরী পারিপার্শ্বিকতায় সবকিছু সামলে উঠতে যে সময় ও সমর্থন জরুরি ছিল দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা থেকে তিনি হয়েছেন সম্পূর্ণই বঞ্চিত। পরাজিত প্রতিশক্তির জঙ্গিবাদী আক্রোশ, সাম্রাজ্যবাদী মতাকেন্দ্রের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, উগ্র বামপন্থা-আশ্রিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংঘর্ষ, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, যুদ্ধবিধ্বস্ততার আভিপেসহ অপশক্তি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও প্রশাসন কাঠামোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। সবশেষে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারীদের চূড়ান্ত অপাঘাতে শাহাদাতের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নাদর্শিত দেশচিত্রের বাস্তবায়নের আগেই পৃথিবীর আলোবাতাস, বর্ণগন্ধের আস্বাদ অসম্পূর্ণ রেখে অন্তর্হিত হন। কিন্তু ১৯৪৭-১৯৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর যে সাড়ম্বর উপস্থিতি তা-ই তাঁকে রাজনৈতিক ইতিহাসের কালপুরুষে পরিণত করে।
জীবনকালের পরিসীমায় পৃথিবীর অনেক স্বর্ণপুরুষই তাঁর কর্মকীর্তির প্রকৃত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন; ব্যক্তিদুর্বলতাও হয়ত সবার ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর থাকতে পারে, কিন্তু কর্মকীর্তির নিরাবেগ মূল্যায়ন একদিন ইতিহাসের ধারাক্রমে সম্ভবপর হয়ে ওঠে। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের প্রতীক্ষা শেষে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশ অনুধাবন করছে বঙ্গবন্ধুর কর্মকীর্তি আসলে কোন মহান উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছিল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিসঞ্চারী আইনী নিরপেক্ষতার ফলেই ইতোমধ্যে ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে মৌলধারায় পরিচালিত হতে দেখেছি তাতে ব্যক্তিগতভাবে এটুকু প্রত্যয় আমি ধারণ করি যে, ইতিহাসের নিরপেক্ষ কাঠগড়ায় জাতিরাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন কিংবা অপরাপর বিশ্বনেতৃত্বের প্রতীক-চিহ্নিত মর্যাদায় অভিষিক্ত হবেন।

লেখক : মাননীয় মন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

Photographs, Audio, Video and Text on Bangabandhu  ***Please use Vrinda Font if there is a problem to read Bangla ***       Click o...